ইতিহাস
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মিলন নারায়ণগঞ্জ জেলা
বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে যে কটি জেলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, নারায়ণগঞ্জ তাদের মধ্যে অন্যতম। শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জেলা একসময় পরিচিত ছিল “প্রাচ্যের ডান্ডি” নামে। শিল্প, বাণিজ্য, আন্দোলন সংগ্রাম, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নারায়ণগঞ্জের অবদান অপরিসীম। এই ব্লগে আমরা নারায়ণগঞ্জ জেলার ইতিহাস থেকে শুরু করে ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বর্তমান অবস্থান পর্যন্ত A to Z বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব।
ভৌগোলিক পরিচিতি
নারায়ণগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত। এর উত্তরে গাজীপুর ও ঢাকা জেলা, দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ, পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পশ্চিমে ঢাকা জেলা। জেলার আয়তন প্রায় ৬৮৪ বর্গকিলোমিটার।
প্রধান নদীসমূহ:
শীতলক্ষ্যা
বুড়িগঙ্গা
মেঘনা
ধলেশ্বরী
এই নদীগুলোই নারায়ণগঞ্জকে বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
নামকরণের ইতিহাস
নারায়ণগঞ্জ নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, ইংরেজ আমলে এখানে বসবাসকারী হিন্দু ব্যবসায়ী বেণীমাধব রায় তাঁর গুরু নারায়ণ দাসের নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বাজার থেকেই ধীরে ধীরে “নারায়ণগঞ্জ” নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাচীন ইতিহাস
মুঘল আমলে নারায়ণগঞ্জ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর। ঢাকা সুবাহর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এখান দিয়ে নীল, পাট, লবণ ও মসলার ব্যবসা পরিচালিত হত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে নারায়ণগঞ্জ আরও গুরুত্ব পায়। ১৮৬৬ সালে এটি পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের প্রাচীন পৌরসভাগুলোর একটি।
নারায়ণগঞ্জ ও পাট শিল্প
নারায়ণগঞ্জকে বলা হত “প্রাচ্যের ডান্ডি” কারণ এখানে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য পাটকল। ব্রিটিশ আমলে পাট ছিল সোনালি আঁশ এবং নারায়ণগঞ্জ ছিল পাট রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র।
উল্লেখযোগ্য পাটকল:
আদমজী জুট মিল
সিদ্দিরগঞ্জ জুট মিল
লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল
আদমজী জুট মিল একসময় বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল ছিল।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী ও গৌরবোজ্জ্বল। এখানকার ছাত্র ও শ্রমিকরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে:
নারায়ণগঞ্জ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনিক এলাকা
পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বহু সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়
বহু শহীদ এই জেলার মাটিতে রক্ত দেন
এখানে গণহত্যা ও নির্যাতনের বহু স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে।
দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহ্য
নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বহু স্থাপনা।
ঐতিহাসিক স্থান
পানাম নগর, সোনারগাঁও
সোনারগাঁও জাদুঘর
কদম রসুল দরগাহ
হাজীগঞ্জ দুর্গ
সোনাকান্দা দুর্গ
ধর্মীয় স্থান
শাহ লঙ্গর মাজার
বাবা আদমের মাজার
হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরসমূহ
সোনারগাঁও: প্রাচীন রাজধানী
সোনারগাঁও ছিল বাংলার অন্যতম প্রাচীন রাজধানী। এটি মুসলিম শাসনামলে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। আজও পানাম নগরের ধ্বংসাবশেষ সেই গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য
নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের মেলবন্ধনে।
লোকসংস্কৃতি:
জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান
নৌকাবাইচ
গ্রামীণ মেলা
খাদ্য সংস্কৃতি:
ইলিশ মাছ
পাটিসাপটা
চিতই পিঠা
খেজুরের গুড়
অর্থনীতি ও শিল্প
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ জেলা।
প্রধান শিল্প:
তৈরি পোশাক শিল্প
পাট শিল্প
সিমেন্ট ও স্টিল কারখানা
বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা ও সাহিত্য
নারায়ণগঞ্জে রয়েছে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য।
উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান:
নারায়ণগঞ্জ কলেজ
তোলারাম কলেজ
সরকারি মহিলা কলেজ
এই জেলা বহু কবি, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজন্মের জন্ম দিয়েছে।
আধুনিক নারায়ণগঞ্জ
আজকের নারায়ণগঞ্জ একটি দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক শহর। ফ্লাইওভার, নতুন সড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আবাসন প্রকল্প এই জেলার চেহারা বদলে দিচ্ছে। তবে পরিবেশ দূষণ ও যানজট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
